মমতার একসময়ের বিশ্বস্ত সহকর্মী থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী
- আপডেট সময় : ০৬:১৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬ ৬৬ বার পড়া হয়েছে
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পালাবদলের পর রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে তাঁকে সর্বসম্মতভাবে বিধায়ক দলনেতা নির্বাচিত করা হয়। শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে তাঁর শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। একসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা শুভেন্দুই এখন তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে এলেন।
বিজেপির প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টিতে জয় পেয়েছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটেছে এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো বিজেপি সরকার গঠনের পথ খুলেছে।
শুক্রবার বিকেলে শুভেন্দু অধিকারীর নাম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর তিনি রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানান। বিজেপির বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে জানানো হয়, বিধায়করা সর্বসম্মতিক্রমে শুভেন্দুকেই নেতা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
মমতার ঘনিষ্ঠ থেকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক যাত্রা পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একসময় তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী। তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন বিস্তার, বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ে তাঁর ভূমিকা তাঁকে রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পেছনে নন্দীগ্রাম আন্দোলন ছিল বড় রাজনৈতিক মোড়। সেই আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের সংগঠক হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম বারবার আলোচনায় আসে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব বাড়তে থাকে। পরে ২০২০ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।
নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর—দুই নির্বাচনে মমতাকে হারানো নেতা
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী হন শুভেন্দু অধিকারী। সেই নির্বাচনে তিনি মমতাকে পরাজিত করেন। ফল নিয়ে বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়ালেও শুভেন্দুর রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত হয়।
এবারের নির্বাচনে তিনি কলকাতার ভবানীপুর আসন থেকেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়েছেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ভবানীপুর দীর্ঘদিন মমতার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাই এই জয় শুভেন্দুর রাজনৈতিক উত্থানকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
কংগ্রেস পরিবার থেকে তৃণমূল, তারপর বিজেপি
পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথির রাজনৈতিক পরিবারে বড় হয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিন কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে অধিকারী পরিবারও সেই দলে যুক্ত হয়।
শুভেন্দু নিজেও ছাত্র রাজনীতি ও স্থানীয় রাজনীতি দিয়ে পথচলা শুরু করেন। কাঁথি পৌরসভা, বিধানসভা, লোকসভা—ধাপে ধাপে তিনি রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ২০০৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে সিপিএম নেতা লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও পরিচিতি পান।
নন্দীগ্রাম আন্দোলন থেকে রাজ্য নেতৃত্ব
নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনের সময় শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলের মাঠপর্যায়ের অন্যতম সংগঠক হয়ে ওঠেন। পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় দফার সরকারে তিনি পরিবহন মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তৃণমূলের ভেতরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানের পর শুভেন্দুর সঙ্গে দলের দূরত্ব বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপিতে যাওয়ার পর থেকেই তিনি তৃণমূল সরকার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেন।
বিরোধী দলনেতা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে
২০২১ সালে বিজেপি ক্ষমতায় না এলেও শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। বিধানসভা ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই তাঁকে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে সরব থাকতে দেখা গেছে। দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, প্রশাসনিক ইস্যুসহ নানা প্রশ্নে তিনি বিরোধী রাজনীতির মুখ হয়ে ওঠেন।
এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থানই এবার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জায়গায় নিয়ে এসেছে। মমতার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা থেকে তাঁর সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, আর সেখান থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী—শুভেন্দু অধিকারীর এই যাত্রা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।












